পাবনায় সিজার করাতে গিয়ে প্রাণ গেল বিলকিসের— পর্ব ৩:
প্রসূতির মৃত্যু নিয়ে অনুসন্ধানী সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিককে হুমকি—তদন্তের দাবি
খালেদ আহমেদ :
পাবনার পুঙ্গলি ইউনিয়নের বিলকিস খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের পর সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, প্রসূতির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ।
সংবাদ সংগ্রহকারী সাংবাদিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ০১৭১৬২৭২১৬৯ নম্বর থেকে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে একটি লিখিত বার্তা পাঠানো হয়। বার্তাটিতে সাংবাদিকের সাহসিকতা ও পেশাগত কাজের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাঁর সন্তানদের এতিম হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়। পাশাপাশি মধ্য রাতে সংবাদ সংগ্রহের জন্য যাওয়ায় তাঁর পছন্দের রং রাতের মতো কালো হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যও ছিল।
সাংবাদিকের দাবি, বার্তাটি তাঁকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। তবে নম্বরটির প্রকৃত ব্যবহারকারী কে এবং বার্তাটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কারও নির্দেশে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রাপ্ত বার্তাটি হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো—
“সত্যের পথে সবসময় চলতে নেই আমি জানি আপনি একজন সৎ সাংবাদিক এতটাও সৎ থাকা ঠিক না যাতে করে আপনার বাচ্চারা এতিম হয় এটা আপনাকে হুমকি দিচ্ছি না এটা ফরিদপুর বাসের পক্ষ থেকে আপনাকে পরামর্শ শুনলাম আপনি নাকি যে কাজটা হাতে নেন সেটা সম্পন্ন করেন অসম্পূর্ণ কাজের রেকর্ড নাকি আপনার নেই আপনি নাকি খুব সাহসী সাধারণত সাদা রং নাকি আপনার পছন্দ না আপনার প্রিয় রং কালো এজন্য এই রাতের আঁধারে ফরিদপুর এসে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন দেখবেন আপনার অপছন্দের রঙ তাই খুব তাড়াতাড়ি আপনার পছন্দের রং এ পরিণত না হয় আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী”
বার্তাটিতে সরাসরি সন্তানদের এতিম হওয়ার কথা উল্লেখ এবং পছন্দের রং পরিবর্তনের ইঙ্গিত থাকায় এর উদ্দেশ্য ও প্রেরকের পরিচয় তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বার্তাটির ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনের পাবনা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত রবিউল ইসলাম বলেন, “এটা মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। আমরা খুব দ্রুতই সংগঠন থেকে লিখিত একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিলকিস খাতুনের মৃত্যুর বিষয়ে পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, কী কারণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে, তা উদঘাটন করতে হবে।
তিনি বলেন, আরএমও, হেলথ ইন্সপেক্টরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে, যাতে তাঁরা প্রাথমিক তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।
সিভিল সার্জন আরও জানান, সন্তান প্রসবের সময় কোনো রোগীর মৃত্যু হলে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বিভাগীয়ভাবে তদন্ত করা হয়ে থাকে। এমপিডিএসআর (MPDSR) ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীর মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এই ঘটনায় তদন্তের আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি হয়েছে কি না, তদন্তের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্তের ফল কী—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিলকিস খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি—
১. হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে অস্ত্রোপচার পর্যন্ত রোগীর শারীরিক অবস্থা কী ছিল?
২. অস্ত্রোপচারটি কে করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের পেশাগত যোগ্যতা ও নিবন্ধন কী?
৩. অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না?
৪. রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন এবং তখন তাঁর অবস্থা কী ছিল?
৫. অ্যাম্বুলেন্সে স্যালাইন ও অক্সিজেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিযোগের সত্যতা কী? রোগীকে স্থানান্তরের সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সহায়তা ছিল কি না?
৬. হাসপাতালের বর্তমান লাইসেন্স, অস্ত্রোপচার পরিচালনার অনুমতি এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে কি না?
৭. সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া নম্বরটির ব্যবহারকারী কে এবং বার্তাটি পাঠানোর উদ্দেশ্য কী ছিল?
একজন প্রসূতির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, রোগীর নিরাপত্তা এবং চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনে।
বিলকিস খাতুনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের বক্তব্য গ্রহণ, অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তরের পরিস্থিতি যাচাই এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
তদন্তে চিকিৎসায় অবহেলা, অনিয়ম বা অনুমোদনহীন কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রমাণ ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
একই সঙ্গে সাংবাদিককে পাঠানো হুমকির উৎস শনাক্ত করে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। জনস্বার্থে সংবাদ সংগ্রহের কারণে কোনো সাংবাদিককে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে হুমকির মুখে ফেলা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিলকিস খাতুনের পরিবার ন্যায়বিচার ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চায়। এখন সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরা।
সিএনএফ টিভি
আমাদের দৃষ্টি জুড়ে বাংলাদেশ

Comments
Post a Comment