পাবনায় সিজার করাতে গিয়ে প্রাণ গেল বিলকিসের— হাসপাতালের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
পর্ব ১:
দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি, বিকেলে অ্যাম্বুলেন্সে বাড়ি ফেরার নির্দেশ
বিশেষ প্রতিনিধি :
ফরিদপুরের গোপালনগরে আব্দুর রশিদ সুপার মার্কেটে অবস্থিত লাইফ কেয়ার হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে পরিচালিত আল-শেফা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর বিলকিস খাতুন নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্বজনদের দাবি, অস্ত্রোপচারের পর নবজাতককে তাঁদের হাতে দিয়ে রোগীর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অসংগতিপূর্ণ তথ্য জানিয়ে আল-শেফার পক্ষ থেকে একটি এম্বুলেন্স ঠিক করে দিয়ে দ্রুত পাবনা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে পথে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।
ঘটনাটি ঘিরে হাসপাতালের চিকিৎসক, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পরিচর্যা, রোগীর অবস্থা গোপন করা হয়েছিল এবং অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তরের সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ঘটনা চিকিৎসায় অবহেলায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণের দিকে ইশারা করে। সে কারণে তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে বিলকিস খাতুনকে আল-শেফা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তাঁকে অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়া হয়। পরে নবজাতককে পরিবারের হাতে তুলে দিয়ে প্রসূতিকে অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তর করা হয়।
বিলকিস খাতুনের স্বামী রেজাউল প্রামানিক (৩৭), পিতা হোসেন প্রামানিক, জানান, অস্ত্রোপচারকক্ষ থেকে নবজাতককে বের করে তাঁর হাতে দেওয়া হয়। এরপর তাঁকে বাড়ি চলে যেতে বলা হয় এবং রোগী সুস্থ হলে শিশুকে নিয়ে আসতে বলা হয়।
রেজাউলের ভাষ্য, নবজাতককে নিয়ে রাস্তায় আসার পর তাঁর সন্দেহ হয়। অন্যদিকে, রোগীর বড় ছেলে নয়ন প্রামানিক (২০) জানান, অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় তাঁকে বলা হয়েছিল, তাঁর মায়ের হাত ধরে দেখলে বোঝা যাবে তিনি বেঁচে আছেন। দ্রুত পাবনা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে বাঁচার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তাঁকে জানানো হয়।
নয়নের দাবি, ওই নির্দেশনা দেওয়ার ব্যক্তি হাসপাতালের একজন পুরুষ চিকিৎসক ছিলেন। তবে তিনি ওই চিকিৎসকের নাম জানাতে পারেননি।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পর থেকে অস্ত্রোপচার এবং পরবর্তী সময়ে অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তর পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তাঁদের মনে একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নিহত বিলকিস খাতুনের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়ার সময় রোগীর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তাঁদের আশ্বস্ত করা হলেও পথে প্রায় চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার যাওয়ার পর স্যালাইন চলা বন্ধ হয়ে যায়। পরে তাঁরা অক্সিজেন সরবরাহও বন্ধ দেখতে পান বলে দাবি করেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাম্বুলেন্সটি পরে কাছাকাছি মঈনুল নামের এক চিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগীকে মৃত ঘোষণা করেন বলে স্বজনেরা জানান।
অ্যাম্বুলেন্স মালিক হৃদয় আহমেদ (২৮) জানান, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স চাওয়ার পর তিনি দ্রুত গাড়ি পাঠান। তাঁর অ্যাম্বুলেন্সের পরিচালক ও চালক সেখানে যান। তাঁর দাবি, রোগীকে জীবিত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়েছিল। খাদ্যগুদাম এলাকায় যাওয়ার পর স্যালাইন বন্ধ হয়ে গেলে রোগীকে মঈনুল নামের চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। ওই চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর অ্যাম্বুলেন্সটি রোগীর বাড়িতে চলে যায়।
তবে অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর জন্য কী ধরনের চিকিৎসা-সহায়তা, পর্যবেক্ষণ ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা ছিল, পথে স্যালাইন বন্ধ হওয়ার কারণ কী এবং রোগীর অবস্থার অবনতি হলে জরুরি চিকিৎসার জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও তদন্ত প্রয়োজন।
বিলকিস খাতুনের স্বজন শাপলা খাতুন (৩০), যিনি দিঘুলিয়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী এবং নিহতের বোন, জানান, হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁদের বলা হয়েছিল সিজার করাতে চাইলে অভিভাবককে ফোন করতে হবে এবং রক্ত পরীক্ষা করতে হবে।
শাপলার ভাষ্য অনুযায়ী, রোগীকে অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর নবজাতককে বাইরে আনা হয়। কিন্তু রোগীর খোঁজ নিতে গেলে তাঁদের বলা হয়, রোগীর চিকিৎসা চলছে।
এলাকার দাই সেলিনা খাতুন (৬০) জানান, হাসপাতালে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর একজন চিকিৎসক এসে আল্ট্রাসনোগ্রাম করেন। চিকিৎসক তখন বাচ্চার অবস্থান ও গর্ভের পানির বিষয়ে কথা বলে সিজার করানোর পরামর্শ দেন। তবে সিজার না করিয়ে বাড়িতে গিয়ে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করার বিকল্পের কথাও বলা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
সেলিনা খাতুন আরও জানান, নবজাতককে পরিবারের হাতে দেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরও রোগীর বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না পেয়ে তাঁরা বারবার জানতে চান। প্রথমে তাঁদের বলা হয়, রোগীর চিকিৎসা চলছে। পরে পরিবারের সদস্যদের আলাদা একটি কক্ষে ডেকে জানানো হয়, সন্তান প্রসবের পর রোগীর হার্ট ব্লক করেছে এবং তাঁকে দ্রুত পাবনায় নিতে হবে।
অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় রোগীর হাতের পালস চলছে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পথে রোগীর দুই হাত ও শরীর ঠান্ডা হয়ে যায় এবং স্যালাইন ও অক্সিজেন চলছিল না বলে তাঁরা দেখতে পান।
সেলিনা খাতুনের বক্তব্য অনুযায়ী, এরপর অ্যাম্বুলেন্সটি মঈনুল নামের এক চিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হলে তিনি রোগীকে মৃত ঘোষণা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন ফোনে কোনো একজনের সাথে কথা হয়েছিল যে রক্ত তো বন্ধ হচ্ছে না লাশতো রাখা যাচ্ছেনা তাড়াতাড়ি এসে নিয়ে যাও। তিনি আরও বলেন সিজারের রোগীর কখনোই এতো রক্ত বের হয়না।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিলকিস খাতুনকে ওই হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁদের প্রতিবেশী নবীয়া খাতুন (৬০)। কয়েক বছর আগে তাঁর মেয়ের সিজার ওই হাসপাতালে হয়েছিল বলে তিনি সেখানে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজনের প্রশ্ন, রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা পরিবার নিজেরা না করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন করেছিল। তাঁদের মতে, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
নিহত বিলকিস খাতুনের বাড়ি পাবনার পুঙ্গলি ইউনিয়নের দত্ত পুঙ্গলি শালকে পাড়া গ্রামে, ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই।
এখন একটাই প্রশ্ন সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর একজন প্রসূতির শারীরিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র কী ছিল, কেন তাঁকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে পাঠানো হলো এবং পথে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই সামনে আসা প্রয়োজন।
চলবে.....
সিএনএফ টিভি
আমাদের দৃষ্টি জুড়ে বাংলাদেশ

Comments
Post a Comment