শ্রমিকের অধিকার ও মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে শিমুল বিশ্বাসের দীর্ঘ পথচলা
নাহিদ হোসেন :
সড়ক পরিবহণ শুধু যানবাহন আর রাস্তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো শ্রমিকের জীবিকা, কোটি মানুষের দৈনন্দিন চলাচল এবং দেশের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি। একটি বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী গাড়ি কিংবা গণপরিবহণের চাকা থেমে গেলে তার প্রভাব পড়ে ঘরের মানুষ থেকে শুরু করে বাজার, শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যে।
এই বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে সড়ক পরিবহণ শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা কেবল একটি সাংগঠনিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকের সুখ দুঃখ, কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, পরিবারের দায়িত্ব এবং পেশাগত ঝুঁকির বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
শিমুল বিশ্বাসের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা। তাঁর দৃষ্টিতে একজন পরিবহণ শ্রমিক কেবল স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসা একজন কর্মী নন। তিনি একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার অন্যতম অংশীদার। তাই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি শ্রেণির দাবি পূরণ করা নয়, বরং একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনকে নিরাপদ করা।
তবে শ্রমিকের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে সাধারণ যাত্রীর নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। একজন চালকের কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিবেশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাস্তায় তাঁর দায়িত্বশীল আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন পরিবহণ শ্রমিকের হাতে যেমন একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে, তেমনি তাঁর দায়িত্বশীলতার ওপর নির্ভর করে অসংখ্য যাত্রীর জীবন।
এই জায়গাতেই শিমুল বিশ্বাসের বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তিনি এমন একটি পরিবহণ ব্যবস্থা চান, যেখানে শ্রমিককে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে না, আবার যাত্রীকেও অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাখা হবে না। মালিক, শ্রমিক, চালক, যাত্রী এবং রাষ্ট্র প্রত্যেকের দায়িত্বকে একটি সুস্পষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনাই তাঁর প্রত্যাশিত সমাধানের পথ।
পরিবহণ খাতের বিশৃঙ্খলার দায় শুধু শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়াকে তিনি সমাধান হিসেবে দেখেন না। একইভাবে শ্রমিকের পরিচয়কে ব্যবহার করে অনিয়মের দায় এড়িয়ে যাওয়ার পক্ষেও তিনি নন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান হলো, যে যেখানে দায়িত্বে আছেন, তাকে সেখানেই দায়িত্বশীল হতে হবে।
কারণ সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন ন্যায়সংগত পরিবেশ। শ্রমিক যদি নিরাপদ কর্মপরিবেশ না পান, যাত্রী যদি নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা না পান, আর পরিবহণ মালিক যদি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকেন, তাহলে শুধু আইন প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা কঠিন।
শিমুল বিশ্বাসের দীর্ঘ শ্রমিক রাজনীতির অভিজ্ঞতা তাঁকে আরেকটি বিষয় শিখিয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা না বলে শ্রমিকদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু কার্যকর সমাধান তৈরি করা যায় না। তাই তাঁর রাজনীতিতে মাঠের মানুষের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব সমস্যার গুরুত্ব রয়েছে।
আজকের বাংলাদেশে পরিবহণ খাতকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ চালক তৈরি, কর্মঘণ্টার বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
এই পরিবর্তনের প্রশ্নে শিমুল বিশ্বাসের অবস্থান পরিষ্কার। তিনি শ্রমিককে বাদ দিয়ে নিরাপদ পরিবহণ চান না, আবার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে পাশ কাটিয়েও শ্রমিকের স্বার্থের কথা বলতে চান না। তাঁর বক্তব্যের মূল জায়গা হলো ভারসাম্য, যেখানে শ্রমিকের মর্যাদা থাকবে এবং যাত্রীর নিরাপত্তাও থাকবে সমান গুরুত্বে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, সেটিকে তিনি শুধু বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। তাঁর প্রত্যাশা, পরিবহণ খাতকে এমন একটি জায়গায় নেওয়া হবে যেখানে শ্রমিক তার পেশা নিয়ে গর্ব করতে পারবেন, যাত্রী নিশ্চিন্তে পথে বের হতে পারবেন এবং রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
শিমুল বিশ্বাসের কাছে রাজনীতির সাফল্য কোনো ব্যক্তির পদ বা পরিচয়ে নয়, মানুষের জীবনে তার প্রভাব কতটা পড়ল সেটিতেই। আর সেই কারণেই শ্রমিকের অধিকার ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নকে তিনি একই রাজনৈতিক বাস্তবতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখেন।
পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর উপলব্ধি একটাই: শ্রমিককে সম্মান দিয়ে, মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেই একটি শক্তিশালী পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটাই হতে পারে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার বাস্তব রাজনৈতিক পথ।
নাহিদ হোসেন
সিএনএফ টিভি।

Comments
Post a Comment