পাবনা হাসপাতালে রোগী জিম্মি—কমিশন বাণিজ্যে ডাক্তার-দালাল চক্র

জুয়েল সানী চৌধুরী :: ​পাবনা জেলার প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল (সদর) হাসপাতাল এখন সাধারণ মানুষের কাছে সেবার আস্থার চেয়ে আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালের ভেতরে এবং বাইরে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী দালাল ও টাউট চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসহায় রোগীরা। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের একশ্রেণীর অসাধু চিকিৎসক ও কর্মচারী এই চক্রের নেপথ্য কারিগর, যাদের মূল লক্ষ্য সেবার নামে রোগীদের পকেট কাটা। ​হাসপাতালের বাইরে ক্লিনিক ও প্যাথলজির মেলা ​সদর হাসপাতালের সীমানা ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য নামে বেনামে ক্লিনিক, প্রাইভেট হাসপাতাল ও প্যাথলজি সেন্টার। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান যেন রোগীদের গিলে খাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব না থাকলেও সেগুলোকে অকেজো করে রাখা বা 'টেস্ট হবে না' বলে রোগীদের কৌশলে বাইরের এসব ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে। ​সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে ওত পেতে থাকে ক্লিনিক ও প্যাথলজির দালালরা। গ্রামীণ সহজ-সরল রোগীরা হাসপাতালে পা রাখা মাত্রই এই দালালেরা 'ভালো ডাক্তার' বা 'দ্রুত রিপোর্ট' দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করে। সরকারি ল্যাবে স্বল্পমূল্যে যে পরীক্ষা হওয়ার কথা, দালালের খপ্পরে পড়ে সেই একই পরীক্ষার জন্য প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগীদের গুনতে হচ্ছে দুই থেকে তিন গুণ বেশি টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুয়া রিপোর্ট দিয়েও রোগীদের সাথে বড় ধরণের প্রতারণা করা হচ্ছে। ​ডাক্তারদের কমিশন বাণিজ্য ও নৈতিক অবক্ষয় ​সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে খোদ সরকারি চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী অনেক রোগীর দাবি, হাসপাতালের দায়িত্বরত ডাক্তাররাই রোগীদের সরকারি ল্যাবে পরীক্ষা না করিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু ক্লিনিক বা প্যাথলজির নাম লিখে দেন। এর বিনিময়ে সেইসব প্রতিষ্ঠান থেকে ডাক্তাররা মোটা অংকের 'কমিশন' গ্রহণ করেন। ফলে হাসপাতালের ভেতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও ডাক্তারদের অসহযোগিতার কারণে রোগীরা বাইরে যেতে বাধ্য হন। সরকারি বেতনভুক্ত চিকিৎসকদের এমন ব্যবসায়ী মানসিকতায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে পুরো স্বাস্থ্য বিভাগ। ​পাবনা সদর হাসপাতালের সীমানায় কেন এত প্যাথলজি আর ক্লিনিকের ভিড় থাকবে—এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। যেখানে সরকারি ওষুধ আর বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা, সেখানে পদে পদে বাটপারি আর দুর্নীতির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ এবং প্যাথলজি বিভাগের সামনে দালালদের আনাগোনা এতই বেশি যে, এটিকে হাসপাতাল না বলে 'ব্যবসা কেন্দ্র' হিসেবে অভিহিত করছেন ক্ষুব্ধ স্বজনেরা। ​হাসপাতাল এলাকায় এই অরাজকতা দিনের পর দিন চললেও কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চললেও কয়েকদিন পরেই আবার পুরনো চিত্র ফিরে আসে। সচেতন নাগরিকদের দাবি, হাসপাতালের ভেতর থেকে দালাল চক্র নির্মূল করতে হবে এবং যে সকল চিকিৎসক কমিশন বাণিজ্যের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ​পাবনা সদর হাসপাতাল কি সাধারণ মানুষের সেবায় থাকবে, নাকি দালাল-টাউট আর মুনাফালোভী চিকিৎসকদের অর্থ উপার্জনের মেশিনে পরিণত হবে—তা এখন সময়ের বড় প্রশ্ন। অবহেলিত মানুষের শেষ ভরসাস্থল এই হাসপাতালটিকে বাঁচাতে হলে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কঠোর হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন। সিএনএফ টিভি।

Comments

Popular posts from this blog

ঈশ্বরদীতে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও সন্ত্রাসের অভিযোগ

পাবনা পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে বই বিতরণে শিক্ষক উত্তমের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

পাবনায় বিদেশি রিভলভারসহ দুইজন গ্রেফতার